মটর অঙ্কুর
শাকসবজি

পুষ্টির মূল তথ্য

মটর অঙ্কুর

কাঁচাঅঙ্কুরিতবীজ
প্রতি
(120g)
10.56gপ্রোটিন
32.53gমোট শর্করা
0.82gমোট চর্বি
ক্যালরি
148.8 kcal
ফোলেট
43%172.8μg
কপার
36%0.33mg
প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড (B5)
24%1.23mg
নিয়াসিন (B3)
23%3.71mg
ম্যাঙ্গানিজ
22%0.53mg
থায়ামিন (B1)
22%0.27mg
ভিটামিন B6
18%0.32mg
ম্যাগনেসিয়াম
16%67.2mg

মটর অঙ্কুর

ভূমিকা

মটর অঙ্কুর বা অঙ্কুরিত মটর হলো অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং সজীব একটি খাবার, যা সাধারণ মটরশুঁটি থেকে অঙ্কুরিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। এই ছোট কিন্তু শক্তিশালী অঙ্কুরগুলো উদ্ভিদ জীবনের শুরুর দিকের সবটুকু জীবনীশক্তি ধারণ করে, যা এদের সাধারণ মটরের তুলনায় ভিন্ন স্বাদ ও পুষ্টিগুণ প্রদান করে। অত্যন্ত সহজলভ্য এবং অল্প সময়ে বাড়িতেই তৈরি করা যায় বলে এটি আধুনিক স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের খাদ্যতালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

অঙ্কুরিত হওয়ার সময় মটরের বীজ তার সুপ্ত অবস্থা থেকে জেগে ওঠে, যার ফলে এর স্বাদ আরও সতেজ, হালকা মিষ্টি এবং অনেকটা কাঁচা মটরশুঁটির মতো হয়। এর কুড়মুড়ে টেক্সচার যেকোনো খাবারের উপস্থাপনায় এক অনন্য মাত্রা যোগ করে। বছরের যেকোনো সময়ে ঘরে বসেই মটর অঙ্কুরিত করা সম্ভব, যা একে সারা বছর ব্যবহারের উপযোগী করে তোলে।

খাদ্য হিসেবে মটর অঙ্কুর শুধু একটি উপাদানের চেয়েও বেশি কিছু, এটি সজীব খাবারের এক চমৎকার উদাহরণ। সালাদ বা স্যান্ডউইচের ওপর সামান্য ছিটিয়ে দিলে তা কেবল খাবারের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং গুণগত মানও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এর দ্রুত বৃদ্ধি এবং ব্যবহারের সহজলভ্যতা একে পুষ্টির এক সহজ উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রান্নায় ব্যবহার

মটর অঙ্কুর ব্যবহারের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর কাঁচা খাওয়ার অভ্যাস, কারণ রান্নার উত্তাপে এর সতেজতা ও পুষ্টিগুণ অনেকাংশে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সালাদে এদের ব্যবহার সবচেয়ে জনপ্রিয়, যেখানে এর কুড়মুড়ে ভাব সবজি বা ফলের স্বাদের সাথে চমৎকারভাবে মিশে যায়। এছাড়া স্যান্ডউইচ, বার্গার বা টোস্টের ওপর ছড়িয়ে দিলে এটি যেমন বাড়তি টেক্সচার দেয়, তেমনি স্বাদেও এক সতেজ আমেজ নিয়ে আসে।

এর মৃদু মিষ্টি স্বাদ লেবু, অলিভ অয়েল, বা ভিনিগারের সাথে খুব ভালোভাবে মানিয়ে যায়। আপনি চাইলে হালকা মশলা বা ভেষজ পাতার সাথে মিশিয়ে একে স্টার্টার হিসেবেও পরিবেশন করতে পারেন। স্যুপ বা নুডলস তৈরির শেষ পর্যায়ে উপরে সামান্য মটর অঙ্কুর ছড়িয়ে দিলে সেটি পরিবেশনার মানকে পেশাদার স্তরে নিয়ে যায়।

ভারতীয় উপমহাদেশে অঙ্কুরিত ডাল বা মটর খাওয়ার ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের, বিশেষ করে সকালের নাস্তায় চানা চাট বা মুড়ির সাথে মিশিয়ে খাওয়া বেশ প্রচলিত। মটর অঙ্কুরও একইভাবে পেঁয়াজ, লঙ্কা এবং লেবুর রস দিয়ে মেখে অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর জলখাবার হিসেবে তৈরি করা যায়। এর বহুমুখী ব্যবহার একে যেকোনো সাধারণ রান্নাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার সুযোগ করে দেয়।

পুষ্টি ও স্বাস্থ্য

মটর অঙ্কুর উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের এক চমৎকার উৎস, যা পেশির গঠন ও শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্ষয়পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে থাকা উচ্চমাত্রার ফলেট কোষের বৃদ্ধি ও পুনর্গঠনে সরাসরি সহায়তা করে। এছাড়াও এতে থাকা আয়রন ও ম্যাঙ্গানিজ শরীরের শক্তি বিপাক প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে এবং ক্লান্তি দূর করতে বিশেষভাবে কার্যকর।

এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও বিভিন্ন ভিটামিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বিশেষভাবে ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের উপস্থিতি স্নায়ুতন্ত্রের সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি ফাইবার ও খনিজ উপাদানের একটি ভারসাম্যপূর্ণ আধার, যা পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

খাদ্যতালিকায় মটর অঙ্কুর অন্তর্ভুক্ত করা তাদের জন্য আদর্শ যারা কম ক্যালোরিতে বেশি পুষ্টি পেতে চান। প্রতিদিনের খাবারে এক মুঠো মটর অঙ্কুর যোগ করলে তা কেবল খাবারের স্বাদই বাড়ায় না, বরং প্রয়োজনীয় অণুপুষ্টির ঘাটতি পূরণে একটি সহজ ও প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে কাজ করে। এটি সব বয়সের মানুষের জন্যই পুষ্টিকর এবং শরীরের সার্বিক সজীবতা বজায় রাখতে বিশেষ উপযোগী।

ইতিহাস ও উৎপত্তি

অঙ্কুরিত বীজ খাওয়ার ইতিহাস প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন সংস্কৃতিতে পাওয়া যায়, বিশেষ করে এশিয়ায় এটি খাদ্যতালিকায় দীর্ঘকাল ধরে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মটরের আদি নিবাস নিয়ে অনেক মতভেদ থাকলেও, এর চাষাবাদ মধ্য এশিয়া এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে শুরু হয়েছিল বলে মনে করা হয়। হাজার বছর ধরে মানুষ মটরশুঁটি ব্যবহারের সময় বিভিন্নভাবে অঙ্কুরিত করার গুণ সম্পর্কে জেনেছে।

ঐতিহাসিকভাবে চীন এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে অঙ্কুরিত শস্য ও বীজ রান্নায় ব্যবহার করার প্রচলন অত্যন্ত প্রবল ছিল। সময়ের সাথে সাথে এই পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং আধুনিক কৃষিতে ও পুষ্টিবিজ্ঞানে অঙ্কুরিত বীজের গুরুত্ব স্বীকৃত হয়। বর্তমানে এটি কেবল সনাতন রান্নার অংশ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে আধুনিক রেস্তোরাঁ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অঙ্কুরোদগমের পদ্ধতিটি মূলত বীজের ভেতরে থাকা এনজাইমগুলোকে সক্রিয় করে তোলে, যা প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ পুষ্টির সহজলভ্য উপায় হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। আজকের দিনে বাণিজ্যিকভাবে মটর অঙ্কুর উৎপাদন আরও উন্নত হয়েছে, যার ফলে এটি এখন সারা বিশ্বের বাজারে সহজলভ্য। এই প্রাচীন খাদ্যাভ্যাসটি বর্তমানে আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় আরও সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।