সেলারি
সেদ্ধ এবং জল ঝরানোশাকসবজি

পুষ্টির মূল তথ্য

সেদ্ধকাণ্ডলবণহীন
প্রতি
(150g)
1.25gপ্রোটিন
6gমোট শর্করা
0.24gমোট চর্বি
ক্যালরি
27 kcal
খাদ্যআঁশ
8%2.4g
ভিটামিন K (ফাইলোকুইনোন)
47%56.7μg
ফোলেট
12%49.5μg
ভিটামিন C
10%9.15mg
প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড (B5)
9%0.48mg
পটাশিয়াম
9%426mg
রিবোফ্লাভিন (B2)
8%0.1mg
ভিটামিন B6
7%0.13mg
ম্যাঙ্গানিজ
6%0.16mg

সেলারি

ভূমিকা

সেলারি বা সেলারি ডাঁটা হলো এপিএসি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি জনপ্রিয় ভোজ্য সবজি, যা তার স্বতন্ত্র স্বাদ এবং মুচমুচে টেক্সচারের জন্য সুপরিচিত। এটি মূলত তার লম্বা, নমনীয় এবং জলপূর্ণ এবং আঁশযুক্ত ডাঁটার জন্য সমাদৃত, যা সারা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রান্নায় ব্যবহৃত হয়। এই সবজিটি তার শীতল প্রকৃতির জন্য পরিচিত এবং যেকোনো খাবারের স্বাদকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে এটি অনন্য ভূমিকা পালন করে। সেলারির সতেজ ঘ্রাণ এবং হালকা নোনতা স্বাদ একে সবজি এবং সালাদ জগতের এক অপরিহার্য উপাদানে পরিণত করেছে।

প্রকৃতিগতভাবে সেলারি তার জলীয় উপাদানের আধিক্যের কারণে খুবই হালকা এবং সতেজ। এটি মূলত একটি শীতকালীন সবজি হলেও বর্তমানে সারা বছরই বিভিন্ন অঞ্চলে এর চাষাবাদ ও প্রাপ্যতা দেখা যায়। সেলারি ডাঁটার বাইরের অংশটি আঁশযুক্ত হলেও ভেতরটা অত্যন্ত রসালো, যা কাঁচা বা রান্না উভয় অবস্থাতেই উপভোগ করা যায়। এর পাতাগুলোও রান্নায় সমানভাবে কার্যকরী, যা মূলত সুগন্ধ বাড়াতে ব্যবহৃত হয়।

রান্নায় ব্যবহার

রান্নায় সেলারি ব্যবহারের বৈচিত্র্য ব্যাপক; একে সাধারণত কাঁচা সালাদে কুচি করে কাটা অথবা স্যুপ বা স্টু তৈরির সময় ব্যবহৃত করা হয়। সেলারি ডাঁটা সেদ্ধ করে বা হালকা ভেজে নিলে এর স্বাদ আরও গভীর হয়। বিভিন্ন ধরণের পাশ্চাত্য ও এশীয় ব্যঞ্জনে এটি একটি প্রধান সুগন্ধিকারক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা অন্য সবজির স্বাদের সাথে চমৎকারভাবে মিশে যায়।

সেলারি ডাঁটার সাথে পেঁয়াজ এবং গাজরের সমন্বয়ে তৈরি 'মিরপোয়া' পাশ্চাত্য রান্নার এক ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। এর হালকা নোনতা এবং সুগন্ধি বৈশিষ্ট্য মাংস বা সামুদ্রিক খাবারের সাথে রান্না করলে খাবারের স্বাদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সালাদের ক্ষেত্রে, এটি আপেল বা বাদামের সাথে মিশিয়ে একটি স্বাস্থ্যকর ও মুচমুচে নাশতা তৈরি করা যায়, যা স্বাদে ও পুষ্টিতে অনন্য।

ঐতিহ্যগতভাবে, সেলারি বিভিন্ন ধরণের চাটনি বা সস তৈরির উপকরণ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এর ডাটাগুলি ভাপিয়ে নিয়ে তার ওপর হালকা লেবুর রস বা মশলা ছড়িয়ে দিলে এটি একটি স্বাস্থ্যকর জলখাবার হিসেবে বিবেচিত হয়। আধুনিক রান্নায় স্মুদি বা জুসের মধ্যেও সেলারি যোগ করার চল রয়েছে, যা পানীয়কে দেয় এক প্রাকৃতিক সতেজতা এবং পুষ্টিগুণ।

পুষ্টি ও স্বাস্থ্য

সেলারি ভিটামিন কে-এর একটি চমৎকার উৎস, যা হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া, এতে থাকা ফোলেট কোষের বিভাজন এবং রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করে। এর উচ্চ মাত্রার জলীয় উপাদান এবং খাদ্যতাত্ত্বিক আঁশ শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে এবং পরিপাক প্রক্রিয়াকে সহজতর করতে দারুণ কার্যকর।

এই সবজিটি বিভিন্ন ধরণের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইটোনিউট্রিয়েন্টে সমৃদ্ধ, যা শরীরের কোষগুলোকে অক্সিডেটিভ চাপ থেকে সুরক্ষা দেয়। সেলারির নিয়মিত গ্রহণ হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। যেহেতু এতে ক্যালোরির পরিমাণ খুবই কম, তাই যারা ওজন নিয়ন্ত্রণে সচেতন তাদের খাদ্যতালিকায় এটি একটি আদর্শ ও পুষ্টিকর সংযোজন হতে পারে।

সেলারি তার পটাশিয়ামের উপস্থিতির জন্য রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও বেশ সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই খনিজটি শরীরের ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা সামগ্রিক হৃদস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক। সেলারির এই পুষ্টিগুণ এবং এর সহজলভ্যতা একে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি উপযুক্ত সবজি করে তোলে।

ইতিহাস ও উৎপত্তি

সেলারি বা Apium graveolens মূলত ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের আদি সবজি হিসেবে পরিচিত। প্রাচীন গ্রিস এবং রোমান সভ্যতায় সেলারির ব্যবহার অত্যন্ত সমাদৃত ছিল, যেখানে এটি শুধুমাত্র খাদ্য হিসেবেই নয়, বরং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং ওষুধ তৈরিতেও ব্যবহৃত হতো। ঐতিহাসিক নথি থেকে জানা যায় যে, প্রাচীনকালে বুনো সেলারি মূলত ঔষধি গুণাগুণের জন্যই বেশি ব্যবহৃত হতো।

মধ্যযুগের দিকে সেলারির চাষাবাদ ধীরে ধীরে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং রান্নায় এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় বাগানগুলোতে সেলারির বিভিন্ন উন্নত জাত উদ্ভাবন করা হয়, যা বর্তমানে আমরা বাজারে দেখতে পাই। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে এই সবজিটি এশিয়া এবং আমেরিকাসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে তার স্থান করে নিয়েছে।

আজকের আধুনিক যুগে সেলারি কেবল একটি সবজি নয়, এটি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের খাদ্যতালিকায় একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। উন্নত কৃষি প্রযুক্তির কল্যাণে সেলারি এখন সারা বছর উৎপাদিত হচ্ছে, যা এর বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর দীর্ঘ ইতিহাস এবং বহুমুখী গুণের কারণে আজও এটি পুষ্টিবিদ এবং শেফদের কাছে সমান জনপ্রিয়।