মটরশুঁটি
ডাল ও লেগিউম

পুষ্টির মূল তথ্য

সেদ্ধবীজলবণহীন
প্রতি
(160g)
8.58gপ্রোটিন
25.01gমোট শর্করা
0.35gমোট চর্বি
ক্যালরি
134.4 kcal
খাদ্যআঁশ
31%8.8g
ম্যাঙ্গানিজ
36%0.84mg
ভিটামিন K (ফাইলোকুইনোন)
34%41.44μg
থায়ামিন (B1)
34%0.41mg
কপার
30%0.28mg
ভিটামিন C
25%22.72mg
ফোলেট
25%100.8μg
ভিটামিন B6
20%0.35mg
নিয়াসিন (B3)
20%3.23mg

মটরশুঁটি

ভূমিকা

মটরশুঁটি, যা সাধারণ মানুষের কাছে কড়াইশুঁটি বা সবুজ মটর নামেও পরিচিত, মূলত একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর লেগুম বা ডাল জাতীয় সবজি। এটি মটর গাছের ভোজ্য বীজ, যা সাধারণত শিমের ফলের ভেতরে ছোট ছোট গোল দানা হিসেবে জন্মে। এর সতেজ সবুজ রং এবং হালকা মিষ্টি স্বাদ এটিকে সারা বিশ্বের রান্নাঘরে একটি জনপ্রিয় উপকরণ করে তুলেছে। ঐতিহাসিকভাবে, মটরশুঁটি মানব সভ্যতার খাদ্যাভ্যাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

সারা বছর ফ্রোজেন বা সংরক্ষিত আকারে পাওয়া গেলেও, শীতকালীন মৌসুমে তাজা মটরশুঁটির স্বাদ ও পুষ্টিগুণ থাকে অতুলনীয়। এই বীজগুলো প্রাকৃতিকভাবেই মিষ্টি এবং রান্নার পর একটি চমৎকার মাখনের মতো টেক্সচার তৈরি করে, যা যেকোনো সাধারণ খাবারকে অনন্য করে তোলে। এর উজ্জ্বল সবুজ বর্ণ এবং সতেজ গঠন যেকোনো সালাদ বা সবজি রান্নায় একটি প্রাণবন্ত রূপ যোগ করে।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জাতের মটরশুঁটি পাওয়া যায়, তবে খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য মিষ্টি মটর বা গার্ডেন পিস সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। গাছ থেকে তোলার পরপরই এগুলোর মিষ্টি ভাব ধীরে ধীরে স্টার্চ বা শর্করায় রূপান্তরিত হতে শুরু করে, তাই টাটকা মটরশুঁটির স্বাদ সবচেয়ে মিষ্টি ও সুস্বাদু হয়। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতির ফলে বর্তমানে সারা বছরই উন্নত মানের মটরশুঁটি সুলভ।

রান্নায় ব্যবহার

মটরশুঁটি রান্না করা অত্যন্ত সহজ এবং এটি বিভিন্ন ধরনের রান্নায় ব্যবহার করা যায়। সবজির স্বাদে হালকা মিষ্টি ভাব আনার জন্য এটি সেদ্ধ করে বা সরাসরি ভাপে রান্না করে ব্যবহার করা হয়। স্যুপ, স্টু বা সালাদে এটি যোগ করলে যেমন পুষ্টির মাত্রা বাড়ে, তেমনি খাবারের রঙের উজ্জ্বলতাও বৃদ্ধি পায়। খুব অল্প সময়ে রান্না করা যায় বলে কর্মব্যস্ত দিনেও এটি একটি আদর্শ সবজি।

মটরশুঁটির মিষ্টি স্বাদের সাথে গোলমরিচ, পুদিনা পাতা, মাখন এবং আদার মিশ্রণ দারুণভাবে মানিয়ে যায়। বিশেষ করে হালকা মশলা দিয়ে ভাজা বা আলু ও পনিরের সাথে মিশিয়ে রান্না করলে এর স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি খাবারে এক ধরণের প্রাকৃতিক ঘনত্ব যোগ করে, যা ঝোল বা কারি জাতীয় রান্নায় বেশ কাজে দেয়। খাবারের স্বাদ বৃদ্ধিতে এর বহুমুখী ব্যবহারের কোনো তুলনা হয় না।

ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার রান্নাঘরে মটরশুঁটির ব্যবহার অপরিহার্য। শীতকালীন জনপ্রিয় খাবার যেমন মটরশুঁটির কচুরি, আলু-মটরের তরকারি বা পোলাওয়ে এর উপস্থিতি খুবই স্বাভাবিক। এছাড়া পাঞ্জাবি স্টাইলের মটর-পনির কিংবা নিরামিষ নিরামিষ খিচুড়িতে মটরশুঁটি ছাড়া যেন উৎসবের রান্না অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এমনকি বিকেলের নাস্তায় সিঙারা বা চপ তৈরিতেও মটরশুঁটি এক বিশেষ স্বাদ যোগ করে।

আধুনিক রন্ধনশৈলীতে মটরশুঁটিকে এখন পেস্ট বা পিউরি হিসেবে বিভিন্ন পাশ্চাত্য খাবারেও ব্যবহার করা হচ্ছে। পাস্তা সস, পিৎজার টপিং কিংবা হেলদি স্মুদি বা হুমাসেও মটরশুঁটির ব্যবহার নতুন ট্রেন্ড হিসেবে উঠে আসছে। এটি কেবল স্বাদ নয়, বরং রান্নার গুণমান এবং পুষ্টির ভারসাম্য রক্ষার জন্যও রাঁধুনিদের প্রথম পছন্দ।

পুষ্টি ও স্বাস্থ্য

মটরশুঁটি পুষ্টির এক শক্তিশালী উৎস, যা উচ্চমানের উদ্ভিজ্জ প্রোটিন এবং আঁশ বা ফাইবার সরবরাহের জন্য পরিচিত। এই উপাদানগুলো আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। এছাড়া এতে থাকা ভিটামিন কে এবং ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং হাড়ের মজবুত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মটরশুঁটিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স এবং ফলেট রয়েছে, যা শরীরের কোষের শক্তি উৎপাদনে এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। এছাড়াও এতে থাকা আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ এবং ম্যাগনেসিয়ামের মতো খনিজ উপাদানগুলো হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণাগুণ শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

যেসব মানুষ নিরামিষভোজী, তাদের জন্য প্রোটিনের চাহিদা পূরণে মটরশুঁটি একটি দুর্দান্ত মাধ্যম হতে পারে। এর সাথে অন্যান্য দানাশস্যের সমন্বয় ঘটালে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব অ্যামিনো অ্যাসিডের সরবরাহ নিশ্চিত হয়। পুষ্টিবিদরা তাই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় মটরশুঁটি রাখার পরামর্শ দেন, বিশেষ করে শিশুদের বৃদ্ধি এবং বয়স্কদের সার্বিক শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য।

ইতিহাস ও উৎপত্তি

মটরশুঁটির ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো, যার উৎপত্তি মূলত ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যে বলে মনে করা হয়। প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে গ্রিস, তুরস্ক এবং মিসরের প্রাচীন বসতিতে মটরশুঁটির জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে এটি কৃষিকাজের একেবারে শুরুর দিকের ফসলগুলোর একটি। আদিম যুগে এগুলো সাধারণত শুকনো অবস্থায় খাওয়া হতো এবং দীর্ঘসময় সংরক্ষণ করা সম্ভব ছিল বলে তা প্রধান খাদ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

মধ্যযুগে মটরশুঁটি ইউরোপজুড়ে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় খাবারে পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে এটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে সাধারণ মানুষের খাদ্য হিসেবে থাকলেও পরে এর পুষ্টিগুণ ও স্বাদের কারণে এটি রাজকীয় রান্নাঘরেও সমাদৃত হয়। বিশেষ করে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের সময়ে টাটকা মটরশুঁটি খাওয়ার চল শুরু হয়, যা সেই সময়ে অত্যন্ত ফ্যাশনেবল একটি বিষয় ছিল।

আঠারো ও উনিশ শতকের দিকে যখন ক্যানিং বা টিনজাতকরণ প্রযুক্তি উন্নত হয়, তখন মটরশুঁটির বিশ্বব্যাপী চাহিদা আরও বেড়ে যায়। পরবর্তীকালে হিমায়ন বা ফ্রোজেন প্রযুক্তি আসার ফলে মৌসুমের বাইরেও সারা বছর মটরশুঁটির স্বাদ গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে। আজ মটরশুঁটি বিশ্বের কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এটি বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তের খাদ্যাভ্যাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।